Tuesday, July 5, 2016

আরও গভীরে মেঘ / আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়


   “অনেক আগুন ভেতর ভেতর জ্বলে”



 অনির্বাণ ভট্টাচার্য






‘আকাশের জন্ম ১৯৯৪-এর বর্ষায়’। হ্যাঁ, শেষ মলাটে এভাবেই পরিচয়পত্র শুরু করেছেন আকাশ - আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়। বর্তমানে বিজ্ঞান শাখার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র উত্তরপাড়ার আকাশ ‘মাস্তুল’ পত্রিকার সম্পাদনা করছেন। ২০১৬য় পাঠক থেকে প্রকাশিত তাঁর বই “আরও গভীরে মেঘ” কিন্তু একেবারেই বলছেনা এটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। ধারে ভারে বেশ পরিণত, বহুমুখীন অথচ বহুর ভিড়েও বেশ অন্যরকম।



আকাশ জানেন “পরিবার আসলে তো নদী”, আকাশ বোঝেন “অনেক আগুন ভেতর ভেতর জ্বলে”।



সেই আকাশের লেখাই কখনো ভীষণ মায়াবী। সেখানে প্রেয়সীকে ডাকার সুরেও কিছুটা তুলনায় এসে যেতে পারে ‘মেঘবালিকার জন্য রূপকথা’র সুর। “একটা বিকেল আঁকব খাতায়/যেঁই বিকেলে চৈতি-আমি/নদীর পাড়ে ঘাটের সিঁড়ি/গজিয়ে ওঠা বট পাকুড়ে/পুঁতব চিঠি শিকড় খুঁড়ে...”। এই আকাশ একইসঙ্গে কবিতার ডিটেইলগুলোর ওপরেও বেশ সতর্ক। “সেখানে কোনোদিন সন্ধে হয় না/সেখানে কেবল আলো নেভে’ – কবিই তো পারে সুক্ষ আঁচড়ে এর ফারাকটা ধরতে। বেঁচে থাকার ক্রাইসিসটা, ভাবতে অবাক লাগে মাত্র বছর বাইশের আকাশ কিভাবে সেটাকে ধরে নিলেন। কেমন অবলীলায় লিখলেন – “কেউ দেখতে পায় একটা রান্নাঘর, যার/অন্যদিকটা শ্মশান পর্যন্ত বিস্তৃত”, অথবা “তোমার সুখের ভিড়ে আমার প্রখর সন্দেহ” কিংবা “এক দরজা দূরত্বে কেশে ওঠে অপত্য,/তুমি ছুটে যাও আশঙ্কায়/আমার আর চেনা হয়ে ওঠে না/মাঝরাতের তোমাকে”। তবু, একদিক থাকে দেখতে গেলে “আরও গভীরে মেঘ” আসলে এই ক্রাইসিস, কষ্ট, না পাওয়া মিলিয়েই একটা নিটোল প্রেমের কবিতার বই। সেখানে মেদহীন কিছু উচ্চারণ রেখে যান আকাশ। “কোনো কোনো রাতে/মাটি অব্দি নেমে দেখো উজ্জ্বল থাকো কিনা” বা “আলতো হাতে একটা সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে বলে –‘ওঠো’!” আবার কখনো কবিই তীব্র স্পষ্টবাদে সময়কে ধরেছেন – “কী হবে তোমার নিশানায়? দেশ জিতবে, পৃথিবী জিতবে তারপর?” কিংবা “বিশ্বাস? সে তো ঘাতকের প্রতিশব্দ”। খুব সহজেই গল্পের ছলে কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রীতি তৈরি করে দিয়েছেন আকাশ। সেখানে লক্ষাধিক মায়ের চুল আঁচড়ানোর দৃশ্য যেমন শেষমেশ একটা লম্বা চুল জামায় লেগে থাকার আখ্যান তৈরি করে তেমনি লাইনে একটি করে লোককে সামনে যেতে দিতে দিতে প্রতিসপ্তাহে কত ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার ক্লাইম্যাক্সে এসে ঠেকে কবিতা। গদ্য কবিতায় খুব সাবলীল্ভাবে ঘোরাফেরা করলেও কবি খুব সচেতন নিখুঁত অন্ত্যমিলেও – “যখন মেজাজ ভালো থাকে, বলে দুটো নে/মায়ের আঁচলে গিঁট বাঁধা ছিল বাতাসা/এসব বর্ষা ভুল করে আসে উঠোনে”। আসলে বেঁচে থাকাটা শুধু তো ক্রাইসিস না, তার মধ্যে দু এক পশলা মায়াও কাজ করে। আকাশ খুব সহজে সেটা ধরতে পেরেছেন – “আমরা অমাবস্যা বলি/গেলে তো যাওয়াই যায়/চলে যেতে ঠিকানা লাগে না” কিংবা “নতুন রাস্তায় যেতে যেতে থমকে দাঁড়াই,/ঢোলা প্যান্ট পরে,/অপেক্ষা করি/এবার পকেটমারি হোক”। পঙক্তিতে সেই মায়া চলকে চলকে ওঠে।

এককথায় ২০১৬র কলকাতা বইমেলার অন্যতম প্রাপ্তি “আরও গভীরে মেঘ”। তৌসিফ হকের প্রচ্ছদ শিল্পিত এবং যথোপযুক্ত, একইসঙ্গে নাম এবং বিষয়বস্তুর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। সবমিলিয়ে কবির নিজের ভাষায় যেমন “ধ্রুবতারার লাজুক চোখে একফোঁটা জল”, তেমনি কবি পরিচিতি এবং সর্বোপরি বইটির পাতায় পাতায় জ্বলজ্বল করা হলদে পাঞ্জাবির আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়ের লাজুক চোখে যে বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ আঁকা হয়ে গেছে, এব্যাপারে সন্দেহ নেই। 

আরও গভীরে মেঘ / আকাশ গঙ্গোপাধ্যায় / পাঠক  

পাখিদের দ্বীপ / সায়ন্তনী নাগ


নিটোল নিখাদ কাহিনী নির্ভর গল্প


বসুন্ধরা মণ্ডল






সায়ন্তনী নাগের ‘পাখিদের দ্বীপ’ বইটি প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে।মোট ২১টি গল্প নিয়ে এই সংকলন। বইটিতে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায়এবং ওয়েব-ম্যাগাজিনে প্রকাশিত গল্প ঠাই পেয়েছে।


 এই সংকলনের গল্পগুলি মূলত নিটোল নিখাদ কাহিনী নির্ভর গল্প। এই সব কাহিনী নির্ভর গল্পগুলির মধ্যে একটু আলাদা স্বাদের ব্যাঞ্জনাধর্মী গল্প হল ‘পাখিদের দ্বীপ’ আর ‘ওরা দুজন’। ‘পাখিদের দ্বীপ’ গল্পটি ইঙ্গিতময় হওয়ায় পাঠক নিজের মতো করে হিসেব মিলিয়ে নিতে পারেন। মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকা কথক চরিত্ররই নাম আসলে সুনীপা। নিজের নাম, অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে সে ভাবছে সুনীপা আসলে তার বন্ধু।অথবা সুনীপা তার অলটার ইগো। এমনও হতে পারে মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগতে থাকা মেয়েটি নিজেই পেশায় ছিল মনরোগবিশেষজ্ঞ। বিবাহিত; যৌন-ক্ষুধার্ত পুরুষের সঙ্গে লিভটুগেদার করার দেড়-দুবছর পর তার বউ বাচ্চা সমেত এসে সামনে দাঁড়ায়। শুধু সেই প্রেম ভেঙে যাওয়ার কষ্ট নয়, পাশাপাশি নিজের সন্তানকে জন্মের আগেই মেরে ফেলার যন্ত্রণা তার এই অবস্থার জন্যে দায়ি। পরিযায়ী পাখি যেমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের দেশ ছেড়ে চলে আসে গরমের দেশে, আবার শীত মিটলে চলে যায় নিজের দেশে, তেমনি রাজু বউয়ের প্রেগ্নেন্সির কারণে শরীরের খিদে মেটাতে আসে তার কাছে, আবার ফিরেও যায় ঠিক সময়ে। তবে কিছু পাখির শাবক যারা এখানকার দ্বীপে জন্মায়, তারা কেউ কেউ থেকেও যায়। কিন্তু তার বাচ্চাটাসেই পরিযায়ী পাখিদের মতো থাকেনি ।তাই সে সেই পাখিদের ছোঁয়া পাওয়ার জন্যে যেতে চায় পাখিদের দ্বীপে।

‘ওরা দুজন’ গল্পটি ব্যাঞ্জনাধর্মী গল্প। রোল-চাউমিনের দোকানদার এই গল্পের কথক। সে নিজের দোকানে আসা দুই তরুণ তরুণীকে ধর্নায়, প্রতিবাদ সভায়, মিছিলে, মোমবাতি মিছিলে দেখতে পায়। কিন্তু তারা অস্বীকার করে সে কথা। ‘জয় জওয়ান স্টলে’র মালিক বুঝে উঠতে পারেনা কেন তারা অস্বীকার করে বারবার। যখন সাধারণ মানুষের জন্যে প্রতিবাদ করা মৃত মানুষদের ছবিতে তাদেরকে দেখতে পায়, তখন সে প্রাণপণে অস্বীকার করতে থাকে:  যে মৃতের দলে তারা রয়েছে। আসলে দুর্নীতি, অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা মানুষ তারা, তাদের মৃত্যু হতে পারেনা। তারা বেঁচে থেকে যায় কথকের মতো গড়পড়তা মানুষের মধ্যে। সেই জন্যেই কথক  নিজে আয়নার সামনে দাঁড়ালে তার নিজেকে ওদের মতো দেখতে লাগে।

সায়ন্তনী নাগের চমকপ্রদ পরিণতির প্রতি বেশ ঝোঁক আছে দেখা যায়। এবং এই চমকপ্রদ পরিণতির কৌশল প্রয়োগ কারার ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য অনেকখানি। যদিও ‘শরণাগত’, ‘নির্দোষ’, গল্প দুটির পরিণতি আগে থেকেই পাঠক আন্দাজ করে নিতে পারেন। কিন্তু ‘ক্যামেরাম্যান’, ‘বকলমে’ গল্পদুটি সত্যিই চমকে দেয়। এক স্বার্থপর ক্যামেরাম্যানের  ডিভোর্সি এক মেয়েকে ব্যাবহার করার গল্প শোনা যায় মেয়েটির বয়ানে। কিন্তু গল্পের পরিণতিতে আসা একটা চিঠি সেই মানুষটা সম্পর্কে কথকের এবং পাঠকের ধারণাকে একটাই আঘাতে একসঙ্গে ভেঙে ফেলে। আত্মকথন রীতির এতো সার্থক ব্যাবহার মুগ্ধ করে। ‘বকলমে’ গল্পের ক্ষেত্রেও দেখা যায় কলেজ জীবন থেকে যার একটি লেখা পড়ে মনের মধ্যে বহু যত্নে তার ভাবচিত্র বানিয়ে ভালবাসা লালন করে গেছেন মানস বাবু, সেই মেয়েটি আসলে মোটেই তেমনটি নয়। যে লেখা পড়ে তিনি মেয়েটির প্রেমে পরেছিলেন তা আসলে লিখেছিল পাশের বাড়ির দেবেন কাকু।

বইটির আটটি অনুগল্প বেশ ভালো লাগে। ‘সন্ধ্যার গল্প’তে খুব অল্প পরিসরে লেখিকা তুলে ধরেন একটা হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ের সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠার প্রয়াসকে। তার মায়ের পাঁকে ডুবে থাকা জীবনের আওতা থেকে বেরতে চাওয়ার কাহিনী। উল্টোদিকে ‘আত্মজা’ গল্পে একটি মেয়ের স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপন, আর তার মায়ের উদ্বিগ্ন জীবন কাটানোর কাহিনী। অন্য অনুগল্পগুলিও পড়তে বেশ ভালো লাগে।
 
লেখিকার কিছু অসাবধানতাও চোখে পড়ে। বিশেষত ‘টুম্পার বসে আঁকো’ গল্পটির ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ অনেক ত্রুটি চোখে পড়ে। বিশেষত ক্রিয়াপদগুলি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আঞ্চলিকতা মুক্ত, কিংবা সঠিক বৈশিষ্ট যুক্ত নয়। শুধুমাত্র সঘোষ ধ্বনিকে অঘোষ, এবং মাহাপ্রান ধ্বনিকে অল্পপ্রান ধ্বনি বানিয়ে দিলেই তা যথাযথ আঞ্চলিক ভাষা হয়ে উঠতে নাও পারে, এটা লেখিকা মনে রাখেন নি। ‘খেলা যখন’ গল্পটির কাহিনী বুনন এই বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে অযৌক্তিক বুনন বলে মনে হয়। কাহিনীতে চমক আনতে গিয়ে যুক্তি জাল ছিন্ন হয়ে গেছে বলে মনে হয়। সুজয়ের মতো শয়তান মানুষকে আত্মগ্লানিতে ভোগানোর জন্যে সব চরিত্রকে লেখিকা খুব মহান বানিয়েছেন। মৌমিতা সুজয়ের সঙ্গে তার অবৈধ সম্পর্কের কথা আগ বাড়িয়ে বলবে এবং তা শুনে বছরের পর বছর রুমেলা সুজয়ের সঙ্গে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করে যাবে, এটা বিশ্বাস যোগ্য নয়। তার চেয়েও অদ্ভুত নিজের স্বামীকে পরকীয়ার কথা জানালেও সুজয়ের বৌকে জানাবে কেন, তার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়না।

সব মিলিয়ে ‘পাখিদের দ্বীপ’ বইটি অসাধারণ না হলেও পড়তে বেশ ভালো লাগে। সবাই যখন ছক ভাঙার পণ করে বিভিন্ন পর্বান্তরে কাহিনী বিন্যাস বা সার-রিয়েলিজম, ম্যাজিক রিয়েলিজমের ছকের মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন, তখন সহজ কথা সহজ ভাবে বলার এই ধরন ভালো লাগে বৈকি!



পাখিদের দ্বীপ / সায়ন্তনী নাগ /নতুন শতক প্রকাশনী কলকাতা-৭০০০২৯

যোগাযোগঃ ৯৮৩০৯০৭৭৯২ 



ঈশ্বরের থেকে গাঢ় / উজান


উজ্জ্বল অপিরিচিতের ডাক



সরোজ দরবার


এক একটা গানের সঙ্গে নানা স্মৃতির যোগ। এক অগ্রজের মুখের গল্প, পড়ার সময় রেডিও শোনার জন্য তাঁর বাবা সেটটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, আর অমনি ‘...আমায় চমকে দাও, চমকে দাও।’ এই গানের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে এই স্মৃতির অটুট সংযোগ। আবার ‘...সব যে হয়ে গেল কালো’- যখন যেখানে কানে আসুক, ভেসে ওঠে মেঘে ঢাকা তারা-র সেই বলিদান সদৃশ সুপ্রিয়া দেবীর মুখের ক্লোজ শট। এ সংযোগ একজনের জন্য নয়, বহুর। এর সঙ্গে আবার স্বতন্ত্র স্মৃতিরও যোগ থাকতেই পারে। এভাবেই যোগে যোগ বাড়ে। মুজতবা আলীর শান্তিনিকেতনের লেখা পড়তে পড়তে অবধারিত মনে পড়ে যায় প্রমথনাথ বিশি-র গুরুদেব প্রসঙ্গ। এক একটা গানে, লেখায়, বলা ভাল, এক একটি প্রসঙ্গের আয়তন এভাবে বেড়ে যায়। বয়স যত পরিণতির দিকে এগোয় এ আয়তন বাড়তে থাকে। মজা হল, আয়তন বাড়লেও এখানে অন্তত ঘনত্ব কমে না। এ একরমের বিপরীতমুখী রসায়ন। যত আয়তন বাড়ে অনুভূতির গাঢ়তা তত বাড়তে থাকে। এই এত্ত কথার আয়তন বাড়ল ওই ‘গাঢ়’ শব্দের প্রসঙ্গেই। হাতে ধরা কবিতার বইয়ের নাম যখন ‘ঈশ্বরের থেকে গাঢ়’।

দু’ফর্মার ছোট্ট বই। কবির হাজারো সাহসী কারিকুরীর চিহ্ন বুকে নিয়ে আছে। সেটাই স্বাভাবিক। ব্লার্বেও সে ইঙ্গিত। তরুণের ভাষার উচ্ছাসেই আগামিদিনের গতিপথ নির্মাণ। যে কোনও নতুন বই পড়াই একরকম অপরিচিতের ডাক। কখনও সখনও সে ডাক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই উজ্জ্বল অপরিচিতের ডাক- শব্দবন্ধটি আমায় শিখিয়ে দিল উজানের প্রথম কবিতার বই। ‘সন্ধ্যেতারা’ সিরিজের তিন নম্বর কবিতায় সে বলে,

‘ভিতর থেকে আমি প্রায় সারাদিনই গম্ভীর হয়ে থাকি। কেননা আমি রোজ ওই কথাগুলির কাছে যাই, থাকি। উজ্জ্বল অপরিচিত কথা আমাকে ডাকে...অসময়ে, অপরিচিতের মতো।’

এ কবিতা শুরু হয়েছিল গল্পচ্ছলে, সংকেতময়তায়-‘তোমার এক বান্ধবী তোমার টিয়ার কথা বলে।’, শেষমেশ পৌঁছল কবিতার দুনিয়ার এক সত্যিতে। তা এই উজ্জ্বল অপিরিচিতের ডাক, এবং সে ডাক আসে অপরিচিতের মতোই। আকস্মিক। মনে পড়ে, কবিতাকে ‘আকস্মিকের খেলা’ বলেছিলেন এক কবি, এবং এ নামে একটি কবিতা নিয়ে গদ্যের বইও আছে। এখন প্রশ্ন হল, আমি কি এই পংক্তিমালায় ঠিক বুঝতে পারছি কবিকে? উত্তরে পৌঁছনোর আগে বলে নেওয়া ভাল, কবিতার আলোচনার মতো মস্ত ব্যর্থতার পাহাড় টপকানো আমার অসাধ্য। আমার চেষ্টা, এই পংক্তিরা আমার কাছে কীভাবে ধরা দিচ্ছে তা তুলে ধরা। এই ‘সন্ধ্যেতারা’ সিরিজটার কাছে অনেকক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করে, প্রেমের মৃদু অথচ গভীর আলো এর চারপাশ আলো করে আছে বলে অনুভব করতে পারি। কী বলে উঠতে চায় সিরিজের প্রথম কবিতার এই পঙক্তিগুলি-

   ‘তুমি আছ’ আর ‘তুমি নেই’ এর মাঝে যে পথ চলে যাচ্ছে
খুব দ্রুত, যে পথ ভরে ওঠা বা ফুরিয়ে যাওয়া...কিছুরই কথা বলে না,
ওই পথ আমি।

এ এক দারুণ ঝুনো প্রেমের অভিব্যক্তি বলেই আমার মনে হয়। কার সঙ্গে সেই ভালবাসা? মনে পড়ে, এক অনুষ্ঠানে সুমনের ‘তোমাকে চাই’ নিয়ে এক শিল্পী তাঁর অনুভবের কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই তুমি কে তা নিয়ে তাঁদের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে অনেক তর্ক হয়েছে এবং শেষমেশ উপলব্ধি, এই তুমি আসলে সংগীত। উপরের লাইনের ‘তুমি’ও তাই তার ব্যক্তিসত্তা ছাপিয়ে আমার কাছে ধরা দিচ্ছে কবিতা হয়েই। এই যে পথের কথা বলছেন কবি, এর সঙ্গে কমবেশি দেখা হয়ে যাওয়া সৌভাগ্য। কবিতা আপনাতে পূর্ণ। কবি শুধু ওই পথটুকু, কখনও যার সঙ্গে কবিতার দেখা হয়, কখনও হয় না। যুগলমিলন হলে আমরা উলু দিই, কবিতার ইতিহাস বাড়ে। আর যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ মাথুর-অপেক্ষা। দেখি কবিও বলছেন-

ঘর সাদা করে বোঝানো হয় না অপেক্ষার চেয়ে সাদা আর কিছু নেই,
অপেক্ষাভাঙা চুম্বনের চেয়ে বড় পুজো হয় না যেমন  
       
এই বোধহয় সেই পুজো, যে কারণে কাব্য আসলে কবির অনুভবে ‘নৈবেদ্য’। এ কবি, তাঁর তারুণ্যের সাহসে হোক বা ‘দৈব’বশত প্রেমিক, উন্মাদ ও নাস্তিককে এমন একাসনে বসিয়েছে, যার কোনও আগুপিছু থাকা অসম্ভব। তাহলে পড়ে থাকল কী? শুধুমাত্র অনুভব থেকে অনুভবে পেরিয়ে যাওয়া। কবি তাই বলবেনই-
কেবলমাত্র পেরিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে অনন্ত টান আছে
তারই প্রতিভায় আমি তোমাকে পেয়েছি-

বিচ্ছেদের চেয়েও বিস্তৃত এক মাঠে,
নতজানুর চেয়েও সমর্পিত এক পূজায়। 

এই পুজো সেই কাঙ্ক্ষিত অনুভবটুকুর জন্য, যা ‘ঈশ্বরের থেকে গাঢ়’। উজানের যাত্রা সেই অভিমুখে। আরও অনেকের মতোই। কিন্তু ইতিমধ্যেই সে পাতার কাছে রেখে এসেছে ‘প্রেমের অধিক জল’। তাঁর আগামী বইয়ের পাতাতে সে জল উচ্ছ্বাসের কলধ্বনি পেরিয়ে শান্ত, থিতু টলটলে দিঘির মতো হয়ে দেখা দেবে এমনটাই আশা।

আরও আশা এই যে, আপাত থিতু যে দিঘির চারপাশে আমাদের বাস, তার আশেপাশের নুড়ি, পাথর, সাপের ব্যাং গিলে ফেলাও নজর এড়াবে না কবির। যদি তরুণের ভাষা আগামিদিনের গতিপথ নির্মাণ করবে বলে এই আকালেও কেউ ভরসা রাখতে পারেন, তবে তরুণও ব্যারিকেড ভেঙে নতুন রাস্তা তৈরির পথ আবিষ্কার যেন না ভুলে যান। ঘুম থেকে ঘুম টপকে যেতে যেতে সন্ধ্যেতারাটিকে দেখা যতখানি জরুরি, ততোখানিই প্রয়োজন বলে মনে হয় তারার তিমিরটুকু উপলব্ধি করাও। ‘আমার সোনার বাংলা’র মায়াকাজল ভালবেসেও আমাদের নাগরিক কবিয়াল চিৎকার করে বলেছিলেন, শুধু আম, কাঁঠাল, কোথায় তোমার মানুষ কোথায়! আমার আশা, আগামীতে কেন্দ্রের উল্টোমুখে যাত্রা হোক উজানের। তাঁর খোঁজে ঢুকে পড়ুক মানুষ। আজ যদি তাঁকে কেউ প্রশ্ন করেন  - ‘একজন শ্রমিক/ হায় কি দুর্বল তার ইউনিয়ন /রেললাইনের দিকে তাকিয়ে ভাবছে /আত্মহত্যা করলে কি বাঁচা যাবে?// অনেকগুলো বাচ্চা/ পোস্টারের কাগজ আর প্যাকিংবাক্সের ঘরে/ খেলে খেলে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে/ ওদের মা ফিরলে তবে খেতে দেবে।// এখন কি আমার শিল্পচর্চা করা মানায়?’’ ( নবারুণ ভট্টাচার্য)- তাঁর কবিতা যেন এ প্রশ্নেরও সমাধান ও ফলাফল খুঁজে দেয়। অন্তত চেষ্টা তো করতেই পারে।  অভিমুখ বদলে গেলে তাঁরই –ঈশ্বর হয়ে ওঠা তোমার অভ্যেস-এর মতো পংক্তি যে কী মারাত্মক সমসাময়িক, অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে তা অনুমান করেই অনেক কিছু আশা করতে ইচ্ছে হয়।      
    
আশা সেখানেই যেখানে অনুভবের গাঢ়তা আছে। এবং ভরসা, উজান নিরাশ করবেন না।
বইয়ের প্রচ্ছদ, ছাপা, বাঁধাই ইত্যাদি যথাযথ। এই অপিরিচিতের উজ্জ্বল ডাক পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ প্রকাশককে। 

ঈশ্বরের থেকে গাঢ় /  উজান / যাপনচিত্র

পাখিরালা / শাশ্বত মুখোপাধ্যায়



কবিতার অন্দরমহলের রাস্তা…



অয়ন ঘোষ 


'পাখিরালা' প্রথম হাতে পাই ২০১৬'র মে নাগাদ। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫'র জানুয়ারী মাসে। রচনাকাল জানুয়ারী ১৯৮৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৫। ১৬ পাতার এই কবিতার বইটি শীলা লাইব্রেরী কতৃক প্রকাশিত। প্রচ্ছদ এমন কিছু জটিল নয়। বরং অনেকটাই সহজ। আমার মনে হয় যে কোনো বইতে তার প্রচ্ছদের তুলনায় অন্তর্বতী স্থলে আসল জিনিসগুলো লুকিয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও আমার অন্যকিছু মনে হয়নি। প্রবেশপূর্বে কবি শাশ্বত মুখোপাধ্যায় ঋত্বিক ঘটকের একটি ক্ষুদ্র প্রশ্নোত্তর পর্ব রেখেছেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন বা উত্তরটি ক্ষুদ্র হলেও প্রয়াসটি কিছুটা হলেও বৃহৎআকার ধারণ করতে পেরেছে। প্রশ্নোত্তর পর্বটি অনেকটা এরকম....

"প্রশ্নঃ আপনি কেন সিনেমা বানান ?

ঋত্বিক ঘটকঃ কেন বানাই? কারণ আমি একেবারেই পাগল। আমি সিনেমা না বানিয়ে থাকতে পারিনা। আমাদের তো কিছু করে বাঁচতে হয়, তাই না ? তাই আমি সিনেমা বানাই। অন্য কোনো কারণ নাই।"
( তথ্য সূত্র- মুখোমুখি, ঋত্বিক-সত্যজিৎ, উদিসা ইসলাম, ভাষাচিত্র প্রকাশন, ঢাকা, বাংলাদেশ। )


এরপর ক্রমশ ভেতরের দিকে ঢুকলে কবির প্রথম কবিতা 'ওয়াচ-টাওয়ার'এর একটি জায়গায় তিনি লিখছেন

" ছাপ্পান্ন বছর
.
.
.
.
.
.
আসুন।"

অনেকটা এইভাবেই পাঠকদের অন্দরমহলের রাস্তা দ্যাখাতে চেয়েছেন কবি। ঠিক তার পরের কবিতাটিতে একটি জায়গায় কবি লিখছেন, 

"বারবার গন্ধ ঝুঁকে যাওয়ায় কদিনের ছুটি নিলাম।
দূরবীন। ক্যাম্প-ফায়ার।"

এখানে সম্ভবত তিনি মোচ্ছবের কথা বলছেন। তারপরই আবার,
"সালমা ইয়াস্মিন্, বর্তমান ঠিকানা- পার্ক সার্কাস।" 

অর্থাৎ কবি তার পরবর্তী গন্তব্যস্থলের দিকে চলেছেন। এরপর 'লিপস্টিক', 'সুরঞ্জনা', 'সন্ধ্যেরা নেমে এলে', 'কোণ','প্যারাম্বুলেটর' ছাড়াও রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি কবিতা। কবির 'পুনর্বাসন' কবিতাটিতে শেষের দিকে একটি অংশে রয়েছে, 

"উর্ণা বলেছে পশ্চিমের পাল্লা খোলা থাকতো বহুদিনই, এভাবেই কিছু একটা ঘটে থাকবে। দেওয়ালের পেইন্টিং খুলতে খুলতে খেয়াল করি আমাদের পুরনো খোলস আর তাজ্জব হয়ে যাই। বেজে যাচ্ছে সমস্ত সন্ধ্যের গান আর দূরের কাঠ চেড়াইয়ের শব্দ শুরু হয় ঠিক তার পরপর। দুজনে ঘুরতে থাকি Salt লেকের বিভিন্ন আইল্যান্ডে।" 

-আমার মনে হয় পাঠকরা, যারা ইতিমধ্যেই বইটি পড়ে ফেলেছেন, তারা কবির মতোই কবিতার সাথে সাথে সল্ট লেকের বিভিন্ন আইল্যান্ডে পৌঁছে গেছিলেন এবং ঘুরে ব্যাড়াচ্ছিলেন।

আরেকটি কবিতা 'সাইরেন'এ কবি লিখেছেন, "৭১ সালে মুক্তি যুদ্ধের সময় বাবা শেষ চিঠি লিখেছিলো আপাকে। এই যে আমি ওঁকে দেখিনি এবং ওঁকে নিয়ে কথা বলে যাচ্ছি, এভাবেই আমি বাবার মধ্যে আর বাবা আমার মধ্যে ঢুকে গেলাম। কারখানায় যারা খাটিয়া পেতে রাখতো তারা Mill বন্ধ হলেই ঘুমোনোর আনন্দে জামা ওড়াত, তারা কেউই আপাকে চেনেনা।" এই পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। কিন্তু তারপরই কবি লিখছেন, "লোহা কারখানাগুলো এ'রকমই, মিস্ রোলগুলো গ্যাস কাটিং করে সরিয়ে ফেলা হয়, "অর্থাৎ, কবি কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছেন তার চিন্তা-ভাবনা, দর্শন এবং শব্দগুলিকে। আমি মনে করি সচেতন পাঠকেরা এইধরনের লেখা নিয়ে অন্তত দু'বার ভাববেন। সবশেষে 'মিনার্ভা' কবিতা দিয়ে তিনি শেষ করেছেন এই ষোলো পাতার বইটি। বইটির মূল্য কুড়ি টাকা, একেবারেই যথোপযোগী বলে আমার মনে হয়েছে। অন্তিমে কবির 'প্যারাম্বুলেটর' কবিতাটি রইলো।


"সোনালীর সমাজতত্ত্বে স্নাতক এবং স্নাতকোত্ত্বর আগ্রাসন, নায়াগ্রার ফাঁদে বসে খবর পড়ছেন সংঘ-মিত্রা। আস্তে আস্তে উঁচু উঁচু সব ভেঙে পরছে আপনার কাঁধে আর এখান থেকেই প্লেন উড়ছে রোজ।"


  

পাখিরালা  /  শাশ্বত মুখোপাধ্যায় / শীলা লাইব্রেরী

যোগাযোগ  : ৮০১৭৭০৫৫৮২